ডিসথাইমিয়া বা পারসিস্টেন্ট ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার (PDD) হলো বিষণ্নতার একটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অন্তত দুই বছর এবং শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে অন্তত এক বছর ধরে উপসর্গ থাকলে এই রোগ নির্ণয় করা হয়। উপসর্গগুলো মেজর ডিপ্রেশনের তুলনায় কম তীব্র হলেও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবন, কর্মক্ষমতা ও সম্পর্কের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে রোগী নিজেই বুঝতে পারেন না যে তিনি একটি চিকিৎসাযোগ্য মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, কারণ দীর্ঘদিন ধরে থাকা এই মনোভাব তার কাছে জীবনেরই একটি স্বাভাবিক অংশ বলে মনে হয়। বিশ্বব্যাপী প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতার শিকার হন, যদিও প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করা কঠিন, কারণ অনেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না।
ডিসথাইমিয়া এর লক্ষণ
ডিসথাইমিয়ার লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে শুরু হয় এবং দীর্ঘদিন স্থায়ী থাকে বলে অনেকে একে ব্যক্তিত্বের অংশ মনে করে ভুল করেন। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
- ⁕ দিনের অধিকাংশ সময় মন খারাপ থাকা।
- ⁕ আগের মতো কোনো কাজে আনন্দ বা আগ্রহ না পাওয়া।
- ⁕ সব সময় ক্লান্ত বা শক্তিহীন অনুভব করা।
- ⁕ আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া এবং নিজেকে অযোগ্য মনে হওয়া।
- ⁕ মনোযোগ ধরে রাখতে ও সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা হওয়া।
- ⁕ ঘুম কম হওয়া বা অতিরিক্ত ঘুমানো।
- ⁕ ক্ষুধা কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া।
- ⁕ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশা বা নিরাশাবোধ।
- ⁕ সামাজিক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা এবং একাকী থাকার প্রবণতা।
- ⁕ সহজে বিরক্ত বা রাগান্বিত হয়ে পড়া, বিশেষত শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে।
দীর্ঘদিন ধরে এসব অনুভূতি থাকায় অনেকেই এটিকে নিজের স্বাভাবিক স্বভাব বলে মনে করেন এবং সাহায্য চাইতে দেরি করেন।
ধরন ও বিশেষত্ব
ডিসথাইমিয়া দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়— উপসর্গ ২১ বছর বয়সের আগে শুরু হলে তাকে Early-Onset এবং ২১ বছর বা তার পরে শুরু হলে Late-Onset হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কখনো কখনো PDD-এর পাশাপাশি Major Depressive Episode দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাকে প্রচলিতভাবে ‘Double Depression’ বলা হয়। এ অবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমাত্রার বিষণ্নতার সঙ্গে সাময়িকভাবে আরও তীব্র উপসর্গ যুক্ত হয়, যা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাকে জটিল করে তোলে।
কারণ
ডিসথাইমিয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করতে পারে, যেমন—
- ⁕ বংশগত বা জিনগত প্রবণতা।
- ⁕ মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যের পরিবর্তন, বিশেষত সেরোটোনিনের মাত্রা।
- ⁕ দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ।
- ⁕ শৈশবের অবহেলা, নির্যাতন বা মানসিক আঘাত।
- ⁕ পারিবারিক অশান্তি বা প্রিয়জন হারানোর শোক।
- ⁕ দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতা, যেমন ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ।
- ⁕ উদ্বেগজনিত সমস্যা বা অন্যান্য মানসিক রোগের লক্ষণ ।
একাধিক কারণ একসঙ্গে মিলিতভাবে কাজ করে ডিসথাইমিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, এবং একক কোনো কারণকে সবসময় সরাসরি দায়ী করা যায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের মধ্যে ডিসথাইমিয়ার প্রকোপ পুরুষদের তুলনায় তুলনামূলক বেশি, এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের মতো পরিস্থিতিও এর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
রোগ নির্ণয়
রোগ নির্ণয়ের জন্য একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সাইকোলজিস্ট রোগীর উপসর্গ, স্থায়িত্ব এবং দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব মূল্যায়ন করেন। প্রয়োজনে থাইরয়েড সমস্যা বা রক্তস্বল্পতার মতো অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা হয়, কারণ এসব শারীরিক কারণেও বিষণ্নতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসা
ডিসথাইমিয়ার চিকিৎসায় সাধারণত নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা হয়—
- ⁕ কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT) সহ বিভিন্ন ধরনের মনোচিকিৎসা।
- ⁕ প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ।
- ⁕ ইন্টারপার্সোনাল থেরাপি, যা সম্পর্কজনিত সমস্যা মোকাবেলায় সহায়ক।
- ⁕ সাইকোলজিস্ট বা চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত ফলো-আপ।
যেহেতু ডিসথাইমিয়া দীর্ঘস্থায়ী, তাই চিকিৎসায় ধৈর্য প্রয়োজন এবং উন্নতি সাধারণত ধীরে ধীরে দেখা যায়। থেরাপি ও ওষুধের সমন্বিত প্রয়োগ প্রায়ই সবচেয়ে কার্যকর ফল দেয়।
জীবনযাপনে করণীয়
চিকিৎসার পাশাপাশি কিছু অভ্যাস রোগীর সুস্থতায় সহায়ক—
- ⁕ নিয়মিত ব্যায়াম করা।
- ⁕ পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং একটি নিয়মিত ঘুমের রুটিন বজায় রাখা।
- ⁕ সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ।
- ⁕ মেডিটেশন, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা রিলাক্সেশন টেকনিক অনুশীলন করা।
- ⁕ পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা।
- ⁕ বাস্তবসম্মত ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করে ধীরে ধীরে দৈনন্দিন কাজে সম্পৃক্ত হওয়া।
- ⁕ প্রয়োজনে কাউন্সেলিং গ্রহণ এবং পরিবারের সহানুভূতিশীল সমর্থন নিশ্চিত করা।
ডিসথাইমিয়া কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা ইচ্ছাশক্তির অভাব নয়; এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। এর নীরব ও দীর্ঘস্থায়ী প্রকৃতির কারণে এটি প্রায়ই অগোচরে থেকে যায়, অথচ সময়মতো চিহ্নিত করা গেলে এর চিকিৎসা তুলনামূলক সহজ। সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা এবং পরিবারের সহযোগিতার মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষ স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনে ফিরে যেতে পারেন। তাই দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ, আগ্রহহীনতা বা হতাশা অনুভূত হলে বিষয়টি অবহেলা না করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
Author: Rumana Riffat, Psychologist
Clinical Review: Mindful Insights Expert Team
Last Updated: September 05, 2026